বাংলাদেশে রিকন্ডিশন্ড জাপানি গাড়ি মানেই নির্ভরতার আরেক নাম। প্রতি বছর হাজার হাজার ক্রেতা জাপান থেকে নিলামভিত্তিক (Auction) ব্যবস্থায় ব্যবহৃত গাড়ি কিনে আনেন। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, সেই গাড়ির ভাগ্য নির্ধারণ করে এক ছোট্ট কাগজ অকশন শীট। এই শীটের একটিমাত্র সংখ্যা, যাকে বলা হয় Auction Grade, নির্ধারণ করে গাড়িটির মান, অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ বিক্রয়মূল্য।
বেশিরভাগ ক্রেতাই প্রথমবার এই শীট হাতে নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন “৪.৫ মানে কী? R মানে কী? আর A1, U2 লেখা জিনিসগুলো আবার কোথায়?”
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজটাই আজ আমরা করব বাস্তব অভিজ্ঞতা আর দীর্ঘদিনের বাজার-বোঝাপড়া দিয়ে।
জাপানি অকশন গ্রেড আসলে কী বোঝায়
জাপানে প্রতিটি ব্যবহৃত গাড়ি নিলামে তোলার আগে পেশাদার ইন্সপেক্টর দ্বারা পরীক্ষা করা হয়। গাড়ির বাহ্যিক অবস্থা, ইঞ্জিন, চেসিস, মাইলেজ থেকে শুরু করে ইন্টেরিয়র সব কিছুই যাচাই করে তারা একটি সামগ্রিক মান নির্ধারণ করেন। এই মানই হলো গ্রেড, সাধারণত সংখ্যা আকারে (S, 6, 5, 4.5, 4, 3.5, 3 ইত্যাদি)। এটি গাড়ির সামগ্রিক স্বাস্থ্য-সারসংক্ষেপ বলা যায়। সংখ্যাটি মূল শিরোনাম, আর এর নিচে থাকে দুটি পরিপূরক তথ্য: একটি হলো ইন্টেরিয়র ও এক্সটেরিয়র লেটার গ্রেড (A থেকে F), অন্যটি ড্যামেজ ম্যাপ, যেখানে গাড়ির দাগ, স্ক্র্যাচ বা পূর্বের রিপেয়ারের চিহ্ন ম্যাপে দেখানো হয়।
সংক্ষেপে বললে সংখ্যাটি হলো সারসংক্ষেপ, আর ম্যাপ ও লেটার হলো গল্প।
গ্রেডের পূর্ণ স্কেল: নতুন থেকে রিপেয়ার্ড পর্যন্ত
বাংলাদেশে আসা অধিকাংশ গাড়ি ৪ থেকে ৪.৫ গ্রেডের মধ্যে পড়ে। কিন্তু জাপানে এই স্কেল আরও বিস্তৃত।
 “As-New” to “Repaired” for Bangladesh car buyers..png)
৯ / ৮ / ৭ — একদম নতুন, ডেলিভারি মাইলেজ বা সদ্য রেজিস্ট্রেশনকৃত গাড়ি।
S — “As New” অবস্থা; গাড়ির ইন্টেরিয়র-এক্সটেরিয়র প্রায় নিখুঁত।
৬ — তিন বছরের কম বয়সী, ৩০,০০০ কিলোমিটারের নিচে। প্রায় নতুন অবস্থার গাড়ি।
৫ — চমৎকার কন্ডিশন; ব্যবহার অল্প, দেখতে প্রায় নতুন।
৪.৫ — খুব ভালো অবস্থার গাড়ি, সামান্য দাগ বা স্ক্র্যাচ থাকতে পারে।
৪ — গড় ব্যবহৃত গাড়ি; হালকা দাগ, শহুরে ব্যবহারের চিহ্ন।
৩.৫–৩ — দৃশ্যমান দাগ, রঙ নষ্ট হওয়া বা ভেতরে ঘষামাজা প্রয়োজন।
২–১–০ — খারাপ অবস্থার, প্রায়ই রিপেয়ার প্রয়োজন।
R / RA — দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু রিপেয়ার করা গাড়ি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ৪ থেকে ৪.৫ গ্রেডের গাড়িই সবচেয়ে জনপ্রিয়। দাম, রক্ষণাবেক্ষণ, আর রিসেল এই তিন দিক থেকেই এগুলো সেরা ভারসাম্য দেয়। আর যাঁরা দীর্ঘমেয়াদে গাড়ি রাখেন, তাঁদের জন্য নির্ভরযোগ্য RA গ্রেড-এর একটি ভালোভাবে রিপেয়ার করা ইউনিটও লাভজনক হতে পারে।
লেটার গ্রেড: ছোট একটি অক্ষর, বড় পার্থক্য
অকশন শীটে আপনি প্রায়ই দেখবেন— Interior Grade: A বা Exterior: B। এই লেটারগুলোও দাম এবং সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে। A মানে একদম পরিষ্কার ও ঝকঝকে, B মানে ভালো কন্ডিশন, C মানে সামান্য দাগ-ধুলো, আর D/E/F মানে ইন্টেরিয়রে উল্লেখযোগ্য ক্ষয় বা দাগ। একই ৪.৫ গ্রেডের দুই গাড়ির দাম আলাদা হতে পারে কেবল ইন্টেরিয়র গ্রেডের কারণে।
উদাহরণস্বরূপ, ৪.৫ গ্রেড কিন্তু Interior C-এর গাড়িতে সামান্য ডিটেইলিং করলেই চলে, কিন্তু ৪ গ্রেড Interior A গাড়িটি সামান্য রঙ করেই নতুনের মতো লাগে।
Carbarn Bangladesh-এর বিশেষজ্ঞরা বলেন ক্রেতাদের উচিত “Interior A বা B”-কে অগ্রাধিকার দেওয়া, কারণ সেটিই প্রথম ইমপ্রেশনে প্রভাব ফেলে, বিশেষত ভবিষ্যৎ রিসেলে।
ড্যামেজ ম্যাপ পড়ার কৌশল: ছোট অক্ষরে বড় বার্তা
অকশন শীটের নিচের অংশে থাকে একটি ছোট গাড়ির চিত্র— যাকে অনেকেই “ড্যামেজ ম্যাপ” বলেন।
এখানে ছোট ছোট কোড দিয়ে দেখানো হয় গাড়ির দাগ, ডেন্ট বা পূর্বে রিপেয়ার করা অংশ।
যেমন:
A1/A2/A3 — ছোট, মাঝারি ও গভীর স্ক্র্যাচ
U1/U2/U3 — ছোট থেকে বড় ডেন্ট
W1/W2/W3 — পুনরায় রঙ করা বা ‘ওয়েভ’ চিহ্ন
S1/S2 — মরিচা বা রস্ট
X / XX — অংশ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বা করতে হবে
বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রেতা A বা U নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন, কিন্তু অভিজ্ঞরা জানেন— W কোডই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো রঙ পরিবর্তন বা রিপেন্ট করা অংশ নির্দেশ করে, যা রিসেলের সময় গাড়ির মূল্য কমিয়ে দিতে পারে।
RA বা রিপেয়ার্ড গ্রেড ঝুঁকি না সুযোগ?
অনেকে RA দেখেই পিছিয়ে যান, ভাবেন এটা “অ্যাক্সিডেন্ট গাড়ি”।
কিন্তু অভিজ্ঞ ক্রেতাদের কাছে RA মানে Research & Advantage।
RA গ্রেড গাড়ি মানেই এটি একসময় দুর্ঘটনায় পড়েছিল, কিন্তু পেশাদারভাবে রিপেয়ার করা হয়েছে।
মূল প্রশ্ন হলো কীভাবে রিপেয়ার হয়েছে? কতটা অংশ পরিবর্তন করা হয়েছে?
যদি চেসিস সোজা থাকে, এয়ারব্যাগ ঠিক থাকে এবং রিপেয়ার কোয়ালিটি ভালো হয়, তাহলে একই মডেলের ৪.৫-এর তুলনায় RA গাড়ি অনেক কম দামে পাওয়া যায়, এবং ব্যবহারে তেমন পার্থক্যও থাকে না।
Carbarn Bangladesh-এর বিশেষজ্ঞরা সবসময় RA গাড়ি কেনার আগে চেসিস, সাসপেনশন আর এয়ারব্যাগ সিস্টেম পেশাদারভাবে পরীক্ষা করতে বলেন কারণ ভালোভাবে রিপেয়ার করা RA ইউনিট এক অর্থে “স্মার্ট বাই”।
গ্রেড যা বলে না, আর আপনি যা জানতে পারেন
অনেকেই মনে করেন গ্রেডই সব বলে দেয়। কিন্তু সত্য হলো—
গ্রেড কেবল বাহ্যিক ও সাধারণ মেকানিক্যাল কন্ডিশনের সারাংশ।
এটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে না
১️ হাইব্রিড ব্যাটারির স্বাস্থ্য (SOH) বিশেষ করে Toyota Aqua, Prius, বা Nissan Note-এর মতো গাড়িতে।
২ কনজুমেবল পার্টস ব্রেক প্যাড, টায়ার, অয়েল ফিল্টার প্রভৃতি।
৩️ সার্ভিস হিস্ট্রি বা মাইলেজের সঠিকতা।
Carbarn Bangladesh প্রতিটি হাইব্রিড গাড়ির জন্য আলাদা Battery SOH Scan Report তৈরি করে, যাতে আপনি জানেন গাড়ির ব্যাটারি কেবল চলছে না, কত বছর কার্যকর থাকবে।
গ্রেড বনাম খরচ: পার্থক্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়
একই মডেলের ৪ এবং ৪.৫ গ্রেড গাড়ির মধ্যে দাম প্রায়ই কয়েক লাখ টাকার পার্থক্য হয়।
কিন্তু এটি আসলে পার্থক্য নয়, বিনিয়োগ।
একটি ৪ গ্রেড গাড়িতে ৩–৪টি প্যানেলে ছোটখাটো রঙ বা স্ক্র্যাচ রিপেয়ার করতে হতে পারে।
৪.৫-এ সেগুলো থাকে না। কিন্তু কখনো কখনো সঠিক প্যানেল মেরামত ও ডিটেইলিং করলে একটি ৪-ও নতুনের মতো উপস্থাপন করা যায়, ৪.৫-এর তুলনায় কম খরচে।
অভিজ্ঞ ক্রেতারা তাই বলেন— “সংখ্যা নয়, গল্প পড়ুন।”
অর্থাৎ গ্রেডের পাশাপাশি ম্যাপ, ইন্টেরিয়র-এক্সটেরিয়র লেটার আর কমেন্ট একসাথে বিশ্লেষণ করতে হবে।
ক্রেতার জন্য সাত ধাপের যাচাই-প্রক্রিয়া
Carbarn-এর পরামর্শে একটি সহজ সূত্র যে গাড়িতে বিনিয়োগ করবেন, তার অরিজিনাল অকশন শীট অবশ্যই সংগ্রহ করুন।
১. শীটের উৎস যাচাই করুন — স্ক্রিনশট নয়, মূল ফাইল দেখুন।
২. চেসিস নম্বর, লট নম্বর, অকশন নাম-তারিখ মেলান।
৩. সংখ্যাগত গ্রেড, ইন্টেরিয়র-এক্সটেরিয়র লেটার এবং ড্যামেজ ম্যাপ একসাথে মিলিয়ে দেখুন।
৪. ইন্সপেক্টরের মন্তব্য পড়ুন ম্যাপের সঙ্গে যেন সামঞ্জস্য থাকে।
৫. মাইলেজ যাচাই করুন সার্ভিস স্টিকার বা ECU রিডের মাধ্যমে।
৬. R/RA হলে আগমনের পর স্ট্রাকচার ও এয়ারব্যাগ সিস্টেম পরীক্ষা করুন।
৭. হাইব্রিড গাড়ির জন্য ব্যাটারি SOH স্ক্যান করুন আন্দাজে নয়, ডেটায় ভরসা রাখুন।
এই প্রক্রিয়া মেনে চললে আপনি নিশ্চিত থাকবেন আপনার কেনা গাড়ি আসল, নিরাপদ, আর মূল্যবান।
উচ্চ গ্রেড (৭–৯) – যখন নতুনের চেয়েও নতুন
সম্প্রতি কিছু জাপানি অকশন হাউজ “S”-এর ওপরে ৭, ৮, ৯ গ্রেড ব্যবহার করছে।
এই গাড়িগুলো মূলত ডেলিভারি মাইলেজ বা সদ্য রেজিস্টার্ড।
বাংলাদেশে এ ধরনের গাড়ি একদম বিরল, এবং দামও অনেক বেশি।
তাই কেউ যদি আপনাকে “Grade 8” গাড়ির প্রস্তাব দেন, সঙ্গে সঙ্গে মূল অকশন শীট যাচাই করুন কারণ উচ্চ গ্রেড মানে উচ্চ ঝুঁকি, বিশেষত জাল শীটের সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: স্মার্ট কেনাকাটার মানদণ্ড
বাংলাদেশের বাজারে ২০২৬ সালের শুরুতে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বিক্রি আবার বাড়ছে।
বিদেশি মুদ্রা স্থিতিশীল, এবং ক্রেতারা আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন।
এখন ক্রেতারা শুধু “চকচকে ছবি” দেখেই সিদ্ধান্ত নেন না, বরং অকশন গ্রেড, ব্যাটারি হেলথ, সার্ভিস হিস্ট্রি সবকিছু মিলিয়ে গাড়ি কেনেন।
এবং এখানেই Carbarn Bangladesh-এর ভূমিকা অনন্য। তারা গাড়ি বিক্রি করে না, বরং বিশ্বাস বিক্রি করে।
অরিজিনাল অকশন শীট উদ্ধার থেকে শুরু করে গ্রেড বিশ্লেষণ, SOH রিপোর্ট তৈরি, এবং বাংলাদেশে আসার পর ফিটনেস ও সার্ভিস গাইডলাইন সব কিছুই তারা একত্রে দেন।
তাদের মতে, “একটি সঠিকভাবে যাচাই করা Grade 4 গাড়ি অনেক সময় Grade 4.5-এর চেয়েও বেশি ‘ভ্যালু ফর মানি’ হতে পারে, যদি সেটির গল্প পরিষ্কার হয়।”
অকশন গ্রেড আসলে একটি সংখ্যার আড়ালে লুকানো বিশাল তথ্যভান্ডার। যদি আপনি তা পড়তে জানেন, তবে আপনি শুধু একটি গাড়ি কিনবেন না একটি নিরাপদ বিনিয়োগ করবেন। জাপানের রাস্তায় যত যত্নে গাড়ি চলে, বাংলাদেশের ক্রেতারও ততটা সচেতন হওয়া দরকার। আজকের দিনেও একটি ভুল গ্রেড বা ভুয়া শীটের কারণে লাখ লাখ টাকা ক্ষতি হতে পারে। তাই মনে রাখুন গাড়ি সুন্দর কিনা তা চোখ বলে, কিন্তু গাড়ি ভালো কিনা তা বলে অকশন শীট। আর সেই শীট সঠিকভাবে পড়তে জানার প্রথম ধাপ হলো বিশ্বাসযোগ্য সহায়তা নেওয়া, যেমন Carbarn Bangladesh, যারা প্রতিটি গাড়ির সত্যতা খুঁজে এনে আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্তের আত্মবিশ্বাস দেয়।